Homeমতামতসংসদে নারী নেতৃত্ব কোনো ‘ট্রফি’ নয়

সংসদে নারী নেতৃত্ব কোনো ‘ট্রফি’ নয়

Published on

Latest articles

‘আরেকটু সাহস দেখালে এবারই বাংলাদেশ নকআউটে উঠত’

আশা জাগিয়েও তিনটি ম্যাচ অল্প ব্যবধানে হেরে এবং একটি জয় নিয়ে ২০২৫ আইসিসি নারী...

বাংলাদেশে বৃহৎ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে ইইউ: রাষ্ট্রদূত মিলার

বাংলাদেশে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি বৃহৎ প্রতিনিধি...

একটি শব্দও কখনো কখনো রাজনৈতিক মানসিকতাকে উন্মোচন করে দেয়। সম্প্রতি এক টেলিভিশন টক-শোতে নারীদের প্রসঙ্গে উচ্চারিত এমনই একটি শব্দ হলো ‘ট্রফি’।

ওই টক-শোতে একজন নারী আলোচক বললেন, ‘এই যে ৫ পার্সেন্টএটা ফিলাপ করার জন্য হয়তো কিছু ট্রফি প্রার্থী বসানো কোনো ব্যাপার ছিল না। জামায়াতের কি মানুষজন নাইজামায়াতের প্রত্যেক নেতৃবৃন্দ-কর্মীদের ছেলেমেয়েরাওয়াইফরা শিক্ষিতপ্রফেশনে আছেন। তাহলে কিছু ট্রফি বসানো যেত।’

তিনি সেখানে আরও বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়েছেতারা সময় নিতে চান। এই যে প্রস্তুতি—রুট লেভেল থেকে নারীকে উঠিয়ে নিয়ে আসা—তাকে তো রিপ্রেজেন্ট করতে হয় মানুষের।’

বক্তব্যে তিনি একাধিকবার ‘ট্রফি’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। যেখানে স্পষ্ট হয়েছে যেনারীদের নেতৃত্বকে এখনো কীভাবে শর্তসাপেক্ষসাময়িক ও প্রতীকী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই বক্তব্য নারীদের জন্য শুধু আপত্তিকর নয়বিপজ্জনকও। কারণএখানে নারী নেতৃত্বকে সরাসরি অস্বীকার করা না হলেও ‘অপেক্ষা’র মোড়কে আবদ্ধ করা হয়েছে এবং তুলনা করা হয়েছে এমন এক ধরনের জড় বস্তুর সঙ্গে, যা কোনো অর্জনের স্মারক কেবল।

ট্রফি’ শব্দটি এখানে নিছক উপমা নয়আরও গভীর চিন্তার প্রতিফলন। ট্রফি কোনোভাবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের অংশ নয়। সংসদে নারী নেতৃত্বকেও যদি এই দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করা হয়তাহলে সেটা সরাসরি গণতন্ত্রের চেতনাকেই অস্বীকার করার শামিল।

জাতীয় সংসদ কোনো প্রদর্শনীর জায়গা নয়বরং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী মঞ্চ। সেখানে নারীর উপস্থিতি কোনো সৌন্দর্যবর্ধক সংযোজন নয়বরং প্রতিনিধিত্বের মৌলিক শর্ত।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়ন তালিকা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়—নারীরা এখনও কতটা প্রান্তিক। দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে সরাসরি নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিত্বের কোনো সুযোগই নেই। সংখ্যার দিক থেকে তারা পিছিয়েহয়তো গুরুত্বের দিক থেকেও।

বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক হয় তখনযখন এই পিছিয়ে থাকার বিষয়ে দলগুলোর পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্টগঠনমূলক ব্যাখ্যা না পাওয়া যায়। এমনকি উল্টো ‘ট্রফি’র মতো শব্দের ব্যবহার হয়।

রাজনীতি যদি জনগণের প্রতিনিধিত্ব হয়তাহলে জনসংখ্যার অর্ধেককে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি বানিয়ে বর্তমান থেকে বাদ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। নারীদের সংসদে পাঠানোকে যদি ‘ঝুঁকি’ বা ‘পরীক্ষা’ হিসেবে দেখা হয়তবে সেটি নেতৃত্বের ধারণাকেই সংকীর্ণ করে তোলে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই প্রশ্ন অনেক আগেই মীমাংসিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারীরা রাষ্ট্রপ্রধানপ্রধানমন্ত্রীসংসদীয় নেতা এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। বাজেটপররাষ্ট্রনীতিপ্রতিরক্ষা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো জটিল ইস্যুতে নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন নিয়মিতভাবেই। সেখানে নারী নেতৃত্ব আর ব্যতিক্রম নয়স্বাভাবিক বাস্তবতা। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অর্ধেকেরও বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ছিলেন নারী।

বহির্বিশ্বের বাস্তবতায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে—যেখানে সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়েসেখানে নীতিনির্ধারণ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক হয়। শিক্ষাস্বাস্থ্যসামাজিক সুরক্ষা ও শিশু অধিকার বিষয়ে সিদ্ধান্তগুলো হয় দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই। অর্থাৎ নেতৃত্বে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি কোনো আবেগী দাবি নয়এটি কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দলের অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। একদিকে নারীদের সম্মান নিশ্চিতের প্রতিশ্রুতিঅন্যদিকে নারীদের প্রতি অনাস্থা—এই দ্বিচারিতা আড়াল করা যায় না।

যদি নারীরা সত্যিই অযোগ্য হনতবে রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে তাদের সাফল্য কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবেআর যদি তারা যোগ্য হন, তাহলে সংসদের দরজা তাদের জন্য এত সংকীর্ণ কেন?

আত্মসমালোচনার জায়গা নারীদের মধ্যেও আছে। প্রকাশ্যে নারী নেতৃত্বকে হেয় করাসংসদে নারীদের অবস্থানকে ‘ট্রফি’ আখ্যা দেওয়া কিংবা নারীদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ—এর সবই নারীদের দীর্ঘ লড়াইকে দুর্বল করে।

মনে রাখতে হবেনেতৃত্ব কোনো লিঙ্গের দান নয়। এটি যোগ্যতাঅভিজ্ঞতা ও দায়বদ্ধতার সমষ্টি।

২০২৬ সালের নির্বাচন নারী নেতৃত্বের জন্য চরম গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এই সময়েও যদি নারীদের প্রকৃত অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া হয়তাহলে শুধু নারীরা নয়ক্ষতিগ্রস্ত হবে গণতন্ত্রের প্রাণ।

সংসদে নারী নেতৃত্ব কোনো ট্রফি নয়এটি অধিকারদায়িত্ব ও প্রতিনিধি শক্তির প্রকাশ। এখনই সময় সেই সত্যকে স্বীকৃতি দেওয়ার। যাতে গণতন্ত্রের মঞ্চে নারীরা শুধু উপস্থিতি নয়প্রভাবও রাখতে পারে। এটিই হবে সত্যিকার পরিবর্তনের সূচনা।

 

জুবাইয়া ঝুমাপিআর প্রফেশনাল

More like this

‘আরেকটু সাহস দেখালে এবারই বাংলাদেশ নকআউটে উঠত’

আশা জাগিয়েও তিনটি ম্যাচ অল্প ব্যবধানে হেরে এবং একটি জয় নিয়ে ২০২৫ আইসিসি নারী...

বাংলাদেশে বৃহৎ নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে ইইউ: রাষ্ট্রদূত মিলার

বাংলাদেশে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি বৃহৎ প্রতিনিধি...

কেন একই ধরনের কনটেন্ট বারবার সামনে আসে

সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোন হাতে নিলেই চোখে পড়ে পরিচিত দৃশ্য—ফেসবুকের নিউজফিড, ইউটিউবের রিকমেন্ডেশন,...