Homeমতামতইসলামি ব্যাংকিং আসলে কতটা ইসলামি?

ইসলামি ব্যাংকিং আসলে কতটা ইসলামি?

Published on

Latest articles

চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতিতে শ্রমিকরা, পণ্য ওঠা-নামা বন্ধ

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত...

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তারকাদের শোক

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শোবিজ অঙ্গনের...

‘যাহারা সুদ খায়, তারা সে ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে, যাকে শয়তান স্পর্শ দ্বারা পাগল করে দিয়েছে। কারণ তারা বলে, “কেনাবেচা তো সুদেরই মতো।” অথচ আল্লাহ কেনাবেচাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।… আর যদি ঋণগ্রহীতা অভাবগ্রস্ত হয়, তবে সচ্ছলতা আসা পর্যন্ত তাকে সময় দেওয়া উচিত…।’ —সূরা আল-বাকারাহ (মুহাম্মদ আসাদের ইংরেজি থেকে অনুবাদ)।

পাকিস্তানে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। ১৯৮৫ সালের মধ্যেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ‘সুদ’ শব্দের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। এর বদলে তারা ‘মার্ক-আপ’ বা লভ্যাংশ শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করে। তবে এই ব্যাংকিং যে আসলে পুরোপুরি ইসলামি ছিল না সেটি পরে স্পষ্ট হয়। এটি কেবল শব্দগত পরিবর্তন মাত্র।

পাকিস্তানে আধুনিক ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সূচনা হয় ২০০২ সালে। ওই বছর প্রথম পূর্ণাঙ্গ ইসলামি ব্যাংক কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে দেশটিতে ইসলামি ব্যাংকিং দ্রুত বিকশিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ইসলামি ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক। পাশাপাশি পাকিস্তানিদের মধ্যেও ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী ব্যাংকে লেনদেনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

ইসলামি ব্যাংকগুলোতে এখন শরিয়াহ বোর্ড আছে। ব্যাংকের কার্যক্রম শরিয়াহসম্মত কি না, এই বোর্ড সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়। স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানেরও (এসবিপি) একটি শরিয়াহ উপদেষ্টা কমিটি আছে। কেবল ব্যাংকিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে পাকিস্তান সরকার বর্তমানে সুকুক (সম্পদ-ভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি বন্ড) ইস্যু করছে। এ ছাড়া ইসলামি লিজিং এবং তাকাফুল নামে ইসলামি ইনস্যুরেন্সও রয়েছে।

আগামী বছর পাকিস্তানে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের রজতজয়ন্তী। এই সময়ে এসে আমাদের ভেবে দেখা দরকার, বর্তমানের এই ব্যাংকিং ব্যবস্থা কোরআনের নির্দেশনার ঠিক কতটা কাছাকাছি? এটি কি সত্যিই ইসলামি আদর্শ অনুযায়ী এগোচ্ছে?

একটি কোম্পানি তার চলতি মূলধনের জন্য এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের জন্য সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে পারে। অন্যদিকে ইসলামি ব্যাংক থেকে তারা মুশারাকা বা মুরাবাহা এবং ইসতিসনা সুবিধা নিতে পারে।

ইসতিসনার একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, একটি কোম্পানি তুলা কেনার জন্য ঋণ চায়। ইসলামি ব্যাংক ১ কোটি রুপি দিয়ে তুলা কিনে তা কোম্পানির কাছে ১ কোটি ১০ লাখ রুপিতে বিক্রি করবে, যা এক বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। অথবা ১ কোটি ৫ লাখ রুপিতে বিক্রি করবে, যা ছয় মাসের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। বাস্তবে ব্যাংক কোনো তুলা কেনে না বা কোম্পানির কাছে বিক্রিও করে না। তবে এমন একটি ধারণা দেওয়ার জন্য কাগজে-কলমে কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।

ব্যাংক কতটা মুনাফা করবে, তা পুরোপুরি নির্ভর করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত পলিসি রেট বা নীতি সুদের হারের ওপর। পলিসি রেট বেশি হলে ব্যাংকের মুনাফাও সমানুপাতিক হারে বেড়ে যায়।

মুশারাকা ব্যবস্থায় ইসলামি ব্যাংক কোম্পানির কাছ থেকে যে মুনাফা আদায় করে, তা-ও স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের পলিসি রেটের ওপরই নির্ভর করে। সাধারণত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যদি পলিসি রেটের চেয়ে ২ শতাংশ বেশি সুদ আদায় করে, তবে ইসলামি ব্যাংকগুলোর দাবিকৃত মুনাফার হারও প্রায় একই থাকে। ঋণের মেয়াদ চলাকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি পলিসি রেট বাড়ায়, তবে ইসলামি ব্যাংকগুলোও তাদের মুনাফার হার একই পরিমাণে বাড়িয়ে দেয়।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেমন কোম্পানির লাভ-লোকসানের তোয়াক্কা না করে নির্দিষ্ট হারে সুদ আদায় করে, ইসলামি ব্যাংকগুলোও ঠিক তেমনই গ্রাহক লোকসানে পড়লে কোনো ক্ষতি বা ঝুঁকি নেয় না। ঋণখেলাপি বা ঋণ পুনর্গঠনের ঘটনা ছাড়া কোনো ইসলামি ব্যাংক কখনো গ্রাহকের লোকসানের কারণে নিজেরা লোকসান গুনেছে বলে শোনা যায় না।

ইসলামের দৃষ্টিতে ঋণ ব্যবস্থা যেমন বাণিজ্যভিত্তিক এবং ঝুঁকি গ্রহণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা, বর্তমানের এই চর্চা তার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। উদাহরণ হিসেবে, স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষ মনে করতে পারে, ইসতিসনা ব্যবস্থার অধীনে কোনো কোম্পানি যদি ১ হাজার বেল তুলা কেনার জন্য ঋণ নেয়, তবে তুলার নতুন দাম যা-ই হোক না কেন, তাদের ১ হাজার বেল তুলার সমমূল্যই ফেরত দেওয়া উচিত। তুলার দাম বাড়লে ব্যাংক লাভ করবে, আর কমলে লোকসান করবে। কিন্তু তুলার দামের যা-ই হোক না কেন, ব্যাংক কোনো নির্দিষ্ট সুদভিত্তিক ‘মুনাফা’ পাবে না।

একইভাবে মুশারাকা ব্যবস্থায় মানুষের ধারণা থাকে যে, কোম্পানি লাভ করলে ইসলামি ব্যাংকগুলোও লাভ করবে, কিন্তু কোম্পানি লোকসান করলে তারা কোনো লাভ পাবে না। তা না হলে এটি কেবল আরবি নামের মোড়কে সাধারণ বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণের মতোই হয়ে যায়।

পাকিস্তানি ইসলামি ব্যাংকগুলোর বর্তমান চর্চায় বাণিজ্যভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকিংয়ের মূল সুবিধাই হারিয়ে যাচ্ছে। সঠিক কোম্পানি খুঁজে ঋণ দেওয়ার ব্যাপারে ব্যাংকগুলোর কোনো আগ্রহ থাকে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মতো যদি মুনাফাও সুদের হারের সঙ্গে একেবারে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়, তবে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের সেই ‘বরকত’ আর থাকে না।

গত বছর পর্যন্ত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী আমানতকারীদের ন্যূনতম মুনাফা দেওয়া ব্যাংকগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু ইসলামি ব্যাংকগুলো এর বিরোধিতা করে বলেছিল যে আমানতকারীদের নির্দিষ্ট মুনাফা দেওয়া ইসলামি নীতির পরিপন্থী। অথচ সেই একই ইসলামি ব্যাংকগুলো এসবিপির পলিসি রেটের ভিত্তিতে গ্রাহকদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা আদায় করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

এই দ্বৈতনীতির মানে হলো, ইসলামি ব্যাংকগুলো অন্য যেকোনো ব্যাংকের চেয়ে বেশি মুনাফা করলেও তাদের গ্রাহকেরা বাণিজ্যিক ব্যাংকের গ্রাহকদের তুলনায় আমানতের ওপর কম মুনাফা পাচ্ছিলেন। সোজা কথায়, ভালো মুসলমান হওয়ার জন্য গ্রাহকদেরকে উল্টো বেশি মূল্য চোকাতে হচ্ছিল। এখনও ইসলামি ব্যাংকগুলো তাদের আমানতকারীদের অপেক্ষাকৃত কম মুনাফা দেয়, যা ইসলামের শোষণবিরোধী নীতির সরাসরি পরিপন্থি।

ঋণগ্রহীতা ঋণ বা সুদ/মুনাফা পরিশোধে দেরি করলে ইসলামি ও বাণিজ্যিক উভয় ব্যাংকই শাস্তিমূলক সুদ আরোপ করে (যা কোরআনের উল্লিখিত আয়াতের পরিপন্থি)। তবে পার্থক্য হলো, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এই অর্থ নিজেদের মুনাফা হিসেবে রেখে দেয়, আর ইসলামি ব্যাংকগুলো তা দান হিসেবে দিয়ে দেয়।

সত্যি বলতে, ইসলামি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যকার এই পার্থক্যটা আসলে বৈশিষ্ট্যে ততটা নয়, যতটা নামের মোড়কে। ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদেরা এই সত্যিটা জানেন, কিন্তু তারা এই আশায় চুপ থাকেন যে ইসলামি ব্যাংকগুলো হয়তো একদিন সত্যিকারের ইসলামি ব্যাংকিংয়ের দিকে এগোবে। তবে রূঢ় সত্য হলো কয়েক দশক পার হলেও সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই। হয়তো ‘ইসলামি’ ব্যাংকগুলো অনেক বেশি লাভজনক হওয়ায় তারা এই ব্যবসায়িক মডেল থেকে বের হতে চায় না।

ইসলামি ব্যাংকাররা তাদের ব্যবসার যৌক্তিকতা বোঝাতে গরুর মাংস খাওয়ার উদাহরণ টানেন। তারা বলেন, হালাল পদ্ধতিতে জবাই না করা গরুর মাংস খাওয়া যাবে না। কিন্তু সঠিকভাবে জবাই করা হলে সেই একই মাংস হালাল হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে এটা চমৎকার কথা। তবে এই কথা ব্যাংকে প্রযোজ্য নয়। কারণ, ইসলামে গরুর মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়নি, শুধু পশু জবাইয়ের একটি নির্দিষ্ট নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

সুদের নিষেধাজ্ঞা আসলে অনেকটা মদ পানের নিষেধাজ্ঞার মতো। মদ চায়ের কাপে খাওয়া হলো নাকি মদের গ্লাসে, তা বিবেচ্য নয়; নিষেধাজ্ঞা সব সময়ই বহাল থাকে। একইভাবে ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্য অনুমোদিত হলেও সুদ পুরোপুরি নিষিদ্ধ, সে আপনি যে আরবি নামেই ডাকুন না কেন।

আমাদের উচিত ইসলামি ব্যাংকিংকে পরিবর্তনশীল মুনাফা এবং ঝুঁকির ভাগ নেওয়ার মতো ইসলামের প্রকৃত নীতিগুলোর আরও কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য জোরালো উদ্যোগ নেওয়া।

________________________________________
(লেখাটি দ্য ডেইলি স্টারের এএনএন অংশীদার পাকিস্তানের ‘ডন’ পত্রিকায় গত ৬ জুন ‘ইজ ইসলামিক ব্যাংকিং ইসলামিক?’ শিরোনামে প্রথম প্রকাশিত হয়।)
 

মিফতা ইসমাইল: পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী।

 

More like this

চট্টগ্রাম বন্দরে কর্মবিরতিতে শ্রমিকরা, পণ্য ওঠা-নামা বন্ধ

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত...

খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তারকাদের শোক

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। শোবিজ অঙ্গনের...

শ্রীলঙ্কায় মেয়াদোত্তীর্ণ ত্রাণ পাঠিয়ে সমালোচিত পাকিস্তান 

 ঘূর্ণিঝড় ডিতওয়াহর প্রভাবে শ্রীলঙ্কায় বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৪৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া এখনো...