Homeমতামতসাংবাদিকের বয়ানে মুজিবনগর সরকারের শপথ

সাংবাদিকের বয়ানে মুজিবনগর সরকারের শপথ

Published on

Latest articles

ভেনেজুয়েলায় নতুন অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রয়টার্সের প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই ভেনেজুয়েলা-সংশ্লিষ্ট নতুন অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন অন্তত চারজন...

সালাউদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে বিসিবি

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ...

একটি অনুষ্ঠান ঘিরে কড়া নিরাপত্তা, কঠোর গোপনীয়তা। রোমাঞ্চকর উত্তেজনা ভারতীয় নিরাপত্তা কাঠামোয়। দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল। ভারত ও বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক জনসংযোগের ঘটনা ছিল এটি। পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর আক্রমণ ঠেকাতে বসেছে অ্যন্টি-এয়ারক্রাফট গানের কয়েকটি ইউনিট। এদিকে যুদ্ধের খবর সংগ্রহের জন্য কলকাতায় অবস্থান করা বিদেশি সাংবাদিকদের হোটেলে হোটেলে ঘুরে ভোর চারটায় কলকাতা প্রেসক্লাবে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছিল। স্কুপ বা ব্রেকিং নিউজের জন্য তাদের নেওয়া হয়েছিল এক অজ্ঞাত স্থানে।

সেদিন ২০০ বিদেশি সাংবাদিকের জন্য ভাড়া করা হয়েছিল ৬০টি গাড়ি। অন্যদিকে যুদ্ধের ডামাডোলে ওইদিন ঠিক কী ঘটতে যাচ্ছে তা জানতে উদগ্রীব ছিলেন কলকাতার মার্কিন কনসাল জেনারেল জর্জ জি বি গ্রিফিন ও ব্রিটিশ ডেপুটি হাইকমিশনার। পুরো শপথ অনুষ্ঠানটি আয়োজনে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সমীর বসু ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্নেল আই রক্ষী এক অসাধ্য সাধন করেছিলেন, যাকে ‘হারকিউলিয়ান টাস্ক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৭ এপ্রিলের ওই আয়োজনটি ছিল মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠান।

১৯৭১ সালে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের সংবেদনশীল এই আয়োজন খুব কাছ থেকে দেখেছেন দ্য স্টেটসম্যানের তৎকালীন সাংবাদিক মানস ঘোষ। ‘বাংলাদেশ ওয়ার: রিপোর্ট ফ্রম গ্রাইন্ড জিরো’ গ্রন্থটিতে সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি। এই গ্রন্থে ‘দ্য ইন্দিরা-তাজ মিটিং’ শিরোনামের একটি অধ্যায় আছে, যেখানে তুলে ধরা হয়েছে মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের শ্বাসরুদ্ধকর চিত্র।

১৯৭১ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইন্দিরা গান্ধী ও তার উচ্চপর্যায়ের সহযোগীদের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের দুই দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই বৈঠকের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত করা। ইন্দিরা গান্ধী সরকারের নীতি-নির্ধারকরা একমত হয়েছিলেন—বাঙালির মুক্তিসংগ্রামে বিশ্ববাসীর সমর্থন আদায় ও আইনগত ভিত্তি তৈরিতে প্রবাসী সরকারের শপথ প্রকাশ্যে বাংলাদেশের ভূ-খণ্ডে হওয়া খুব প্রয়োজন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রথম দফায় ব্যর্থ হওয়ার পর শপথের জন্য নতুন স্থান নির্ধারণ করা হয় মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানকে, যা পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলার খুব কাছে। আর এই জায়গার সঙ্গে কলকাতার সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল যুতসই। এই শপথ অনুষ্ঠানের স্থান নির্বাচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল প্রবাসী সরকারের সদস্য ও বিদেশি সাংবাদিকদের যাতায়াত।

শপথের এই স্থান নির্ধারণে বড় ভূমিকা ছিল বিএসএফের তৎকালীন প্রধান কেএফ রুস্তমজি ও আঞ্চলিক প্রধান গোলক মজুমদারের। মেহেরপুরের এই আমবাগানের তিন দিকে ভারতের সীমান্ত। যে কারণে আকাশপথে এখানে পাকিস্তানের আক্রমণের ঝুঁকি কম ছিল। এরপরও ভারতীয় আকাশসীমা লঙ্ঘন করে পাকিস্তানি বিমান হামলা ঠেকাতে শপথ অনুষ্ঠানের কয়েক ঘণ্টা আগে বসানো হয়েছিল অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট গান।

সাংবাদিক মানস ঘোষের মতে, ১৯৭১ সালের এপ্রিলে যুদ্ধের খবর সংগ্রহে ভারতে সবচেয়ে বেশি বিদেশি সাংবাদিক অবস্থান করছিলেন। এর আগে ১৯৬২ সালে ভারত-চীন অথবা ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের খবর সংগ্রহের সময় এত বেশি বিদেশি সাংবাদিক একসঙ্গে ভারতে অবস্থান করেননি। এই সাংবাদিকদের ঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা ছিল একটি কঠিন কাজ। আবার শপথের আগে নিরাপত্তার স্বার্থে মূল ঘটনা কাউকে জানাতে চায়নি ভারত সরকার। তাই ছিল উত্তেজনা, উৎকণ্ঠা।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল ভোরে বিদেশি সাংবাদিকরা যখন কলকাতা প্রেসক্লাবে আসেন, তখন কেউই জানতেন না তাদের গন্তব্য কোথায়। এমনকি কলকাতার সংবাদপত্র দ্য স্টেটসম্যানের সাংবাদিক মানস ঘোষও জানতেন না তাদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে। এমনকি গাড়ির চালকও জানতেন না গন্তব্য। চালকদের জন্য নির্দেশনা ছিল ভিভিআইপি কনভয় অনুসরণ করার। এর বাইরে কেউই তেমন কিছু জানতেন না। মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রিসভার সদস্যদের ভিভিআইপি কনভয়ে ছিল ভারতীয় কমান্ডোদের কড়া নিরাপত্তা। পেছনে চলছিল সাংবাদিকদের গাড়ির বহর।

মানস ঘোষ উল্লেখ করেছেন, কলকাতা থেকে রওনা হওয়ার পর কল্যাণী এলাকায় পৌঁছে তারা বুঝতে পারেন ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনী তাদেরকে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তার আগে তিনিসহ বিদেশি সাংবাদিকরা ঘুণাক্ষরেও জানতেন না আসলে কী ঘটতে যাচ্ছে, তাদের কোথায় নেওয়া হচ্ছে! কলকাতা থেকে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা পথে গাড়িবহরটি একবার যাত্রাবিরতি নিয়েছিল। তখন মানস ঘোষ দেখতে পান, তাজউদ্দীন আহমদের বিশেষ সহযোগী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম একটি নথি খুব মনোযোগ দিয়ে বারবার পড়ছেন। পরে তিনি জানতে পারেন, এটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র।

সাংবাদিক মানস ঘোষের তথ্য অনুযায়ী, মুবিজনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের সার্বিক বিষয় দেখভাল করছিলেন খসরু ফরমোরজ রুস্তমজী ও গোলক মজুমদার। এই দুইজনের মাধ্যমে শপথের দিন আরও দুইজন বাংলাদেশি কূটনীতিক বৈদ্যনাথতলায় উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেন পাকিস্তানের দিল্লি হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব কেএম সাহাবুদ্দিন ও সহকারী প্রেস কর্মকর্তা আমজাদুল হক। ২৫ মার্চের পর বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করলে তাদের দুইজনকে পাকিস্তানের দিল্লি দূতাবাস থেকে অপমানজনকভাবে থেকে বের করে দিয়েছিল পাকিস্তানি কর্মকর্তারা। এমনকি তাদের মালপত্রও রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ভারতীয় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সহযোগিতায় এই দুই কর্মকর্তা মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন।

শপথের জন্য ভিভিআইপি ও সাংবাদিকদের নিয়ে গাড়িবহরটি বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে পৌঁছায় সকাল ১১টার দিকে। ঘন আমবাগানের আচ্ছাদনে ছিল বিএসএফের কড়া নিরাপত্তা। পশ্চিমবঙ্গের ভূখণ্ডে বনগাঁও ও কল্যাণীর আকাশে ছিল ভারতীয় যুদ্ধবিমান। আশঙ্কা ছিল—যেকোনো সময় পাকিস্তানি বিমান আক্রমণ করতে পারে।

কলকাতা থেকে প্রায় ৭ ঘণ্টার যাত্রা শেষে মেহেরপুরের আমবাগানে পৌঁছেও বিদেশি সাংবাদিকরা তাদের সেখানে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে পারেনি। কোথায় স্কুপ, কোথায় ব্রেকিং নিউজ! স্বভাবতই তারা খুব বিরক্ত ছিলেন। কয়েকজন মার্কিন সাংবাদিক প্রবল বিরক্তির সঙ্গে প্রশ্ন করেছিলেন—আপনারা কি আমাদের আমের ফলন দেখাতে এই বাগানে নিয়ে এসেছেন? সেই সময় বাংলাদেশের পক্ষে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, নাটকীয় কিছু দেখার জন্য দয়া করে আরেকটু অপেক্ষা করুন। তখন পাশের একটি গ্রাম থেকে হারমোনিয়াম আনা হয়। কয়েকজন ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি অনুশীলন করেন। ইতোমধ্যেই সীমান্তের দুই পাশ থেকেই কিছু উৎসুক মানুষ আমবাগানে জড়ো হয়েছিলেন। অনেকেই গাছে উঠে পড়েন ঠিক কী ঘটছে তা ভালোভাবে দেখার জন্য। যদিও এই আমবাগানে কী ঘটতে যাচ্ছে তা বেশিরভাগ মানুষই জানতেন না।

সাংবাদিক মানস ঘোষ উল্লেখ করেন, এক পর্যায়ে তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব একটা সামান্য উঁচু স্টেজে ওঠেন। তখনই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়। এটা মুজিবনগর সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ অনুষ্ঠান। এরপর দিনাজপুরের জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) অধ্যাপক ইউসূফ আলী বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এতে বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর অধ্যাপক ইউসূফ আলী অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে শপথ পড়ান। গাওয়া হয় জাতীয় সংগীত। এরপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও পাঁচজন মন্ত্রী সামান্য উঁচু ওই মঞ্চে গিয়ে দাঁড়ান। সাংবাদিকরা মুজিবনগর সরকারের ঐতিহাসিক ছবিটি তোলেন। এরপর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ।

এতকিছুর মাধ্যমেই সফলভাবে শপথ নেয় মুজিবনগর সরকার। এর মাধ্যমেই নিশ্চিত হয় যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নাইজেরিয়ার বায়াফ্রা অঞ্চলের মতো কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নয়, এটি ন্যায়সঙ্গত স্বাধীনতা সংগ্রাম। এর শক্ত আইনি ভিত্তি আছে। আর এই যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে আইনসিদ্ধ, জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি বৈধ সরকারের মাধ্যমে।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

তথ্যসূত্র:
• The Indira-Taj meeting (Page: 104-112), Bangladesh War: Report from ground zero, New Delhi
• Ghosh, Manash (2021) Bangladesh War: Report from ground zero, New Delhi: Niyogi Books
• হাসান, মঈদুল (২০১০) মূলধারা ৭১, ঢাকা: ইউপিএল 
• ইসলাম, আমীর-উল (১৯৯১) মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ঢাকা: কাগজ প্রকাশনা
• সাক্ষাৎকার ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম (২০১৫)

More like this

ভেনেজুয়েলায় নতুন অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রয়টার্সের প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই ভেনেজুয়েলা-সংশ্লিষ্ট নতুন অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন অন্তত চারজন...

সালাউদ্দিনের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছে বিসিবি

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সিনিয়র সহকারী কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ...

দেশে এখন দুটি পক্ষ, একটি সংস্কারের পক্ষে ও অন্যটি বিপক্ষে: হাসনাত

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, এখন বাংলাদেশে দুইটা পক্ষ—একটা...